শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন

শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন
অর্জুন তোমার আমার বহুবার জন্ম হয়েছে। সে কথা তোমার মনে নেই, সবই আমার মনে আছে।

Monday, September 2, 2013

বর্ণপ্রথা ও হিন্দু সিমাজে এর উপযোগিতা



বর্ণপ্রথা বর্তমান হিন্দু সমাজের একটি অংশ হয়ে গেছে। বর্ণপ্রথা আজ সমাজে বর্ণ ভেদ বলে পরিচিত।এ লেখায় আমরা আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বিশেষ করে আদি ও প্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদের আলোকে বর্ণপ্রথার সঠিক বিশ্লেষণ ও বর্তমান যুগের প্রেক্ষিতে এর উপযোগিতা বর্ণনা করার চেষ্টা করব।

শুরুতেই জেনে রাখা ভাল বর্ণ প্রথা বলে ধর্মগ্রন্থ সমূহে কোন শব্দ বা টার্ম নেই। আছে ‘বর্ণাশ্রম’। শাব্দিক অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ‘বর্ণ’ শব্দটি এসেছে ‘Vrn’ থেকে; যার অর্থ ‘to choose’  বা পছন্দ করা অর্থাৎ পছন্দ অনুযায়ী আশ্রম বা পেশা নির্ধারণ করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আমাদের সমাজে এখন তা জন্মসূত্রে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ বাঙালী হিন্দুদের নামের পাশে চট্টপাধ্যয় ,ভট্টাচার্য দেখলেই আমরা মনে করি সে ব্যাক্তি ব্রাহ্মণ সন্তান এবং জন্ম সুত্রে তিনি নিজেও ব্রাহ্মণ।

তবে আজ সমাজে যে বর্ণ ভেদ আমরা দেখতে পাই এর একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে,আছে এক বিবর্তনের ইতিহাস। যে বিবর্তনের ধারায় বর্ণাশ্রম এক সময় বর্ণ প্রথা তারপর বর্ণভেদে পরিণত হল। এ ইতিহাসটুকু না জানলে আজ আমরা অনেকেই হয়ত বৈদিক সমাজের চিন্তা বিদগণকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাড় করাব।

বৈদিক ইতিহাস থেকে জানা যায় আদিতে সমাজের দুটি প্রধান অংশ ছিল। একটি অংশকে বলা হত দ্বিজ বা ব্রাহ্মণ। তাদের স্বতন্ত্র চিন্তাশক্তি ও কর্মদক্ষতা ছিল। অর্থাৎ তাঁরা শিক্ষা দীক্ষায় অধিক অগ্রসর ছিলেন। ঠিক যেমন বর্তমান সমাজের একটা অংশ শিক্ষায় উন্নত; যারা  সমাজে সুশীল সমাজ হিসেবে পরিচিত।আর অন্য অংশটির নাম ছিল দ্বিজতোর বা শূদ্র যারা ছিল সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ। কিন্তু এ বিভাজন জন্মসূত্রে ছিল না,ছিল কর্ম, গুন, পেশা, দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে। [সে যুগে অনেক জন্মসূত্রে দ্বিজতর বা শূদ্র ব্যক্তি দ্বিজত্ব লাভ করেন- যা আমরা পরে দেখাব।]

সব সমাজ সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হতে থাকে । ফলে সমাজস্থ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের রুচি ও চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে ধীরে ধীরে।এতে সমাজে কর্ম বণ্টনের প্রয়োজন সৃষ্টি হয়। তৈরি হয় নব নব কর্ম ক্ষেত্র, পেশা ও বৃত্তির। সমাজের এই শাশ্বত ধারা এখনকার আধুনিক সমাজেও দৃষ্টি গোচর হয়।

এ ভাবেই আদি সমাজ তার পরিবর্ধনের সাথে নানা পেশা ও বৃত্তির উদ্ভব হতে থাকে। আর সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশ ঐ পেশায় দক্ষ হয়ে অথে।উদাহরনস্বরূপ আমরা আলোচনা করতে পারি যারা মাটির কাজ করেন অর্থাৎ পাল সম্প্রদায়ের কথা। যেহেতু পূর্বে বর্তমানের মত কর্ম ক্ষেত্রের এত সংখ্যাধিক্য ছিল কারণ সমাজের নির্দিষ্ট কিছু চাহিদার প্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট কিছু পেশা ছিল তাই একজন পাল সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের সন্তান তাঁর পারিপার্শ্বিক ও স্বভাবসিদ্ধ বা বংশগত কারনেই মাটির কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন এবং পিতার পরেই পুত্র উত্তরাধিকার সূত্রে এ পেশাকে আঁকড়ে ধরেন। এভাবে সমাজ বিজ্ঞানের সুত্রমেনে ক্রমান্বয়ে পেশা গুলো হয়ে উঠল বংশগত।সঙ্ঘবদ্ধতা মানুষের স্বভাব তাই পাশপাশি কয়েকটি পাল পরিবার মিলে গড়ে উঠল পাল পাড়া বা পাল পল্লী।  এতে সমাজে ঐক্যবদ্ধতা এল, বাড়ল সামাজিক নিরাপত্তা।এ ধরনের সমাজে সামাজিক মর্যাদার সমতা রক্ষা হত ।ফলে পারস্পরিক সহযোগিতা সহজতর হয়ে উঠল।পরস্পরের মধ্যে সহজ ও সাবলীল সম্পর্ক গড়ে উঠল তাদের সম মর্যাদার ভিত্তিতে।সমাজ নির্মাণের এ ধ্রুব সত্য মেনে তাঁরা নিজেদের ছেলে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে সম্পর্কে দৃঢ় করল।সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে তাঁরা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উথল।আজকের দিনে অনেকেই ভিন্ন সমাজে নিজেদের সন্তানদের বিয়ে দিতে চান না; ভাবেন এতে বুঝি ধর্মের অবমাননা হয়। এবার একটু চিন্তা করে বলুন তো একজন শিক্ষকের ছেলের সাথে কি চিকিৎসকের মেয়ের বিয়ে দিতে ধর্মের কোন বাধা আছে?নাই।তেমনি বিভিন্ন বর্ণের বা পেশার মধ্যেও আত্মীয়তা করতে ধর্মে কোন নিষেধ নাই। আবার একজন ব্যবসায়ী চাইতে পারেন তাঁর ছেলেকে বিয়ে দেবেন তাঁর পরিচিত অন্য একজন ব্যবসায়ীর মেয়ের সাথে; কারণ তাঁদের দু পরিবারের সামাজিক মর্যাদা বা স্ট্যাটাস সমান আর পরিবার দুটির মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে।আসলে বর্ণপ্রথার ধারণটাও এর ব্যতিক্রম নয়।        

বর্তমান সমাজে পেশা বৃত্তি উন্মুক্ত ও সহজলভ্য। সমাজের যে কেউ শিক্ষা অর্জন করে যে কোন পেশায় অংশগ্রহণ করতে পারেন।তাই এ সমাজে আদি সমাজের বর্ণপ্রথার উপযোগিতা হারিয়েছে। যে প্রথা একসময় সময়ের প্রয়োজনে সৃষ্টি হয়েছিল তা সমাজের সাথে সাথে মূল্যহীন হয়ে গেছে।এ সমাজে একজন অশিক্ষিত কৃষকের সন্তানও চিকিৎসক, প্রকৌশলী ,আইনজীবী বা যে কোন ধরনের পেশা বেছে নিতে পারেন তাঁর মেধা, যোগ্যতা, শিক্ষার গুনে।

আসুন এবার দেখি সনাতন সমাজে বহুল প্রচলিত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র সম্পর্কে আমাদের পবিত্র ‘বেদ’ এ কি আছে—

ঋগবেদ ১.১১৩.৬

"
একজন জ্ঞানের উচ্চ পথে(ব্রাক্ষ্মন) ,অপরজন বীরত্বের গৌরবে(ক্ষত্রিয়) , একজন তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে(পেশাভিত্তিক), আরেকজন সেবার পরিশ্রমে(শূদ্র)। সকলেই তার ইচ্ছামাফিক পেশায়,সকলের জন্যই ঈশ্বর জাগ্রত।

ঋগবেদ ৯.১১২.১

একেকজনের কর্মক্ষমতা ও আধ্যাত্মিকতা একেক রকম আর সে অনুসারে কেউ ব্রাক্ষ্মন কেউ ক্ষত্রিয় কেউ বেশ্য কেউ শূদ্র।

ব্রাক্ষ্মন কে? ঋগবেদ ৭.১০৩.৮

যে ঈশ্বরের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত, অহিংস,সত্‍,নিষ্ঠাবান, সুশৃঙ্খল,বেদ প্রচারকারী, বেদ জ্ঞানী সে ব্রাক্ষ্মন।

ক্ষত্রিয় কে?

ঋগবেদ ১০.৬৬.৮

দৃড়ভাবে আচার পালনকারী, সত্‍কর্মের দ্বারা শূদ্ধ, রাজনৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন,অহিংস,ঈশ্বর সাধক,সত্যের ধারক ন্যায়পরায়ন,বিদ্বেষমুক্ত ধর্মযোদ্ধা,অসত্‍ এর বিনাশকারী সে ক্ষত্রিয়।

বৈশ্য কে? অথর্ববেদ ৩.১৫.১

দক্ষ ব্যবসায়ী দানশীল চাকুরীরত এবং চাকুরী প্রদানকারী।

শূদ্র কে?

ঋগবেদ ১০.৯৪.১১
যে অদম্য,পরিশ্রমী, ­ অক্লান্ত জরা যাকে সহজে গ্রাস করতে পারেনা,লোভমুক্ত ­ কষ্টসহিষ্ণু সেই শূদ্র।

এ হচ্ছে নির্ভেজাল যোগ্যতা অনুযায়ী ব্যবস্থা। যেমনভাবে এখনকার সময়ে ডিগ্রী প্রদান করা হয়, যজ্ঞোপবীত দেয়া হতো বৈদিক নিয়ম অনুসারে। তাছাড়া, আচরণবিধির সাথে অসম্মতি ঘটলে যজ্ঞোপবীত নিয়ে নেয়া হতো বর্ণগুলোর। ডাক্তার এর ছেলে যেমন ডাক্তার হবেই এমন কোন কথা নেই।ডাক্তার এর ঘরে জন্ম নিলেই এম.বি.বি.এস এর সার্টিফিকেট যেমন পাওয়া যায়না ঠিক তেমন ব্রাহ্মন এর ঘরে জন্ম নিলেই ব্রাহ্মন হওয়া যায়না।বৈদিক বর্নাশ্রম ও একই। বৈদিক ইতিহাসে অনেক উদাহরণ রয়েছে এ ধরনের-




(ক) ঋষি ঐতরেয়া ছিলেন দাস বা অপরাধীর পুত্র কিন্তু তিনি পরিণত হন শীর্ষ ব্রাহ্মণদের মধ্যে একজন এবং লেখেন ঐতরেয়া ব্রাহ্মন এবং ঐতরেয়াপোনিষদ। ঐতরেয়া ব্রাহ্মনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয় ঋগবেদ বোঝার জন্য।

(
খ) ঋষি ঐলুশ জন্মেছিলেন দাসীর ঘরে যিনি ছিলেন জুয়াখোর এবং নিচু চরিত্রের লোক। কিন্তু এই ঋষি ঋগবেদের উপর গবেষণা করেন এবং কিছু বিষয় আবিষ্কার করেন। তিনি শুধুমাত্র ঋষিদের দ্বারা আমন্ত্রিতই হতেন না এমনকি আচার্য্য হিসেবেও অধিষ্ঠিত হন। (ঐতরেয়া ব্রহ্ম ২.১৯)

(
গ) সত্যকাম জাবাল ছিলেন এক পতিতার পুত্র যিনি পরে একজনব্রাহ্মণ হন।

(
ঘ) প্রীষধ ছিলেন রাজা দক্ষের পুত্র যিনি পরে শূদ্র হন। পরবর্তীতে তিনি তপস্যা দ্বারা মোক্ষলাভ করেন প্রায়ঃশ্চিত্তে র পরে। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.১.১৪) যদি তপস্যা শূদ্রদের জন্য নিষিদ্ধ হতো যেমনভাবে উত্তর রামায়ণের নকল গল্প বলে, তাহলে প্রীষধ কিভাবে তা করল?

(
ঙ) নবগ, রাজা নেদিস্থের পুত্র পরিণত হন বৈশ্যে। তার অনেক পুত্র হয়ে যান ক্ষত্রিয়। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.১.১৩)

(
চ) ধৃষ্ট ছিলেন নবগের (বৈশ্য) পুত্র কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন এবং তার পুত্র হন ক্ষত্রিয়। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.২.২)

(
ছ) তার পরবর্তী প্রজন্মে কেউ কেউ আবার ব্রাহ্মণ হন। (বিষ্ণু পুরাণ ৯.২.২৩)

(
জ) ভাগবত অনুসারে অগ্নিবেশ্য ব্রাহ্মণ হন যদিও তিনি জন্মনেন এক রাজার ঘরে।

(
ঝ) রাথোটর জন্ম নেন ক্ষত্রিয় পরিবারে এবং পরে ব্রাহ্মণ হন বিষ্ণু পুরাণ ও ভাগবত অনুযায়ী।

(
ঞ) হরিৎ ব্রাহ্মণ হন ক্ষত্রিয়ের ঘরে জন্ম নেয়া সত্ত্বেও। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.৩.৫)

(
ট) শৌনক ব্রাহ্মণ হন যদিও ক্ষত্রিয় পরিবারে জন্ম হয়। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.৮.১) এমনকি বায়ু পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ ও হরিবংশ পুরাণ অনুযায়ী শৌনক ঋষির পুত্রেরা সকল বর্ণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

একই ধরনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় গ্রীতসমদ, বিতব্য ও বৃৎসমতির মধ্যে।

(
ঠ) মাতঙ্গ ছিলেন চন্ডালের পুত্র কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন।

(
ড) রাবণ জন্মেছিলেন ঋষি পুলৎস্যের ঘরে কিন্তু পরে রাক্ষস হন।

(
ঢ) প্রবৃদ্ধ ছিলেন রাজা রঘুর পুত্র কিন্তু পরে রাক্ষস হন।

(
ণ) ত্রিশঙ্কু ছিলেন একজন রাজা যিনি পরে চন্ডাল হন।

(
ত) বিশ্বামিত্রের পুত্রেরা শূদ্র হন। বিশ্বামিত্র নিজে ছিলেন ক্ষত্রিয় যিনি পরে ব্রাহ্মণ হন।

(
থ) বিদুর ছিলেন এক চাকরের পুত্র কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন এবং হস্তিনাপুর রাজ্যের মন্ত্রী হন।


 
 


"শূদ্র" শব্দটি বেদে দেখা গেছে প্রায় ২০ বারের মতো। কোথাও এটি অবমাননাকরভাবে ব্যবহৃত হয়নি। কোথাও বলা হয়নি শূদ্রেরা হলো অস্পর্শযোগ্য, জন্মগতভাবে এই অবস্থাণে, বেদ শিক্ষা হতে অনুনোমোদিত, অন্যান্য বর্ণের তুলনায় নিম্ন অবস্থাণের, যজ্ঞে অনুনোমোদিত।

বেদে বলা হয়েছে শূদ্র বলতে বোঝায় কঠিন পরিশ্রমী ব্যক্তি। (তপসে শূদ্রম্‌ - যজুর্বেদ ৩০.৫) একারণেই পুরুষ সুক্ত এদের ঘোষনা দিয়েছে মানব সভ্যতার কাঠামো হিসেবে।

এজন্যেই পবিত্র বেদ ঘোষনা করেছে সাম্যের বানী- অজ্যেষ্ঠাসো অকনিষ্ঠাস এতে সং ভ্রাতারো তাবৃধুঃ সৌভগায় যুবা পিতা স্বপা রুদ্র এযাং সুদুঘা পুশ্নিঃ সুদিনা মরুদ্ভঃ ॥ (ঋগবেদ ৫.৬০.৫)

বঙ্গানুবাদ :কর্ম ও গুনভেদে কেউ ব্রাহ্মন,কেউ ক্ষত্রিয়,কেউ বৈশ্য,কেউ শুদ্র।তাদের মধ্যে কেহ বড় নয় কেহ ছোট নয়।ইহারা ভাই ভাই । সৌভাগ্য লাভের জন্য ইহারা প্রযত্ন করে ।ইহাদের পিতা তরুন শুভকর্ম ঈশ্বর এবং জননীরুপ প্রকৃতি।পুরুষার্থী সন্তানই সৌভাগ্য প্রাপ্ত হন।

আজ অনেকে বর্ণ ভেদকে অস্বীকার করলেও ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেবার সময় ঠিকই গোত্র জাতি উচু নিচু ভেদাভেদ করেন।তাদেরকে বলতে চাই যখন ধর্মগ্রন্থেই বর্ণ ভেদ, মানুষের মাঝে উঁচু নিচু ভেদাভেদ কে নিশিদ্ধ ঘোষণা করে দেয়া আছে তখন তাকে লালন করা অধর্মেরই নামান্তর। মহাভারতে বিশ্বামিত্রের(ব্রাহ্মণ) কন্যা শকুন্তলার সাথে(যিনি ঋষি কণ্বের আশ্রমে বড় হন) বিয়ে হয় ক্ষত্রিয় রাজা দুশ্মন্তের সাথে। অর্থাৎ তথা কথিত উচ্চ বর্ণের স্ত্রী ও নিম্ন বর্ণের পুরুষের মধ্যকার প্রতিলোম বিয়ে।
আবার একই গ্রন্থে ক্ষত্রিয় রাজা শান্তনুর সাথে জেলে কন্যা সত্যবতীর অনুলোম বিয়েও দেখতে পাই। যদি বর্ণ বিয়ের ক্ষেত্রে কোন যোগ্যতার মাপকাঠি হত তাহলে তৎকালীন কোঠরভাবে বেদ শাসিত সমাজে এ ধরনের অসংখ্য বিয়ে সম্ভব হত না।

অনেকে আবার বর্ণভেদই শুধু মানেন না বর্ণভেদের সাথে সাথে ছুতমার্গ নামক এক বিকৃত রুচিও মেনে থাকেন।অর্থাৎ স্বঘোষিত উচ্চবর্ণের লোকেরা তথাকথিত নিচু বর্ণের লোকেদের ছোঁয়া এড়িয়ে চলেন  এমনকি তাঁদের ছায়া পর্যন্ত মাড়ান না। এ সকল বিকৃত মনা হিন্দুদের জন্যে রামায়ণের একটি কাহিনি শোনাতে চাই।আশাকরি সে কাহিনী জানার পর অন্তত তাদের বিকৃত মনের পরিবর্তন হবে।
পিতৃ সত্য রক্ষার্থে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ বনবাসে যাবার পথে শর্বরী বুড়ি নামক এক  বৃদ্ধার কাছে আশ্রয় নেন।আর দশ জনের মত দেশের জনপ্রিয় যুবরাজ রামচন্দ্রের ভক্ত সেই বৃদ্ধাও।পরম স্নেহে তাঁদেরকে তিনি যত্ন করেন এবং কুল বা বরই খেতে দেন। বৃদ্ধা দশরথ তনয় রামকে এত ভালবাসতেন যে কুল গুলো যথেষ্ট মিষ্টি কিনা বা কোন পোকা আছে কিনা এ ভয়ে নিজে আগে সব গুল ফলে কামড় দিয়ে নিরীক্ষা করে দেখছেন আর ভগবান রামচন্দ্র তা ভক্তিভরে খেয়ে নিচ্ছেন।আশা করি এ কাহিনির মর্ম আমাদের তথাকথিত বিকৃত মনা ধর্মপ্রাণ ছুতমার্গ উচ্চবর্ণের হিন্দুরা বুঝতে পেরেছেনসত্যি কথা বলতে তারা যেন আজ নিজেদেরকে ভগবানেরও উপরে আসনে আসীন করতে চান।ভগবান রামচন্দ্র নির্ভয়ে উচ্ছিষ্ট ফল খেয়েছেন ,তাঁর জাত চলে যায়নি।আর তাদের জাত চলে যায় নিম্নবর্ণের ছোঁয়াতে, ছায়াতে।
এছাড়া শ্রীরামচন্দ্র তাঁর উপনয়ন কালে প্রথম ভিক্ষা গ্রহন করেন ধনী কামারানির কাছ থেকে।রামচন্দ্রের বনবাস কালে গুহক চণ্ডালের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব রামায়ণে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে।
দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণ বৈশ্য জননীর স্তনদুগ্ধ পান করেছেন। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু বলেছেন,
“চণ্ডাল চণ্ডাল নহে, যদি কৃষ্ণ বলে/ ব্রহ্মাণ ব্রাহ্মণ নহে, যদি অসৎ পথে চলে।


জাতিভেদ যারা মানে তারা শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ , গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকে ভগবান, ঈশ্বরের অবতার মানেন কিন্তু তাঁদের জীবন আদর্শকে মানেন না।   
ভগবান নিশ্চিন্তে জন্মেছেন, খেয়েছেন, বড় হয়েছেন, তাঁর লীলা প্রকাশ করেছেন, বন্ধুত্ব করেছেন সব গোত্র, জাতি সমাজে অথচ আজ ঐ সকল তথাকথিত উঁচু বর্ণের লোকেরা ভয় পান সমাজে তাদের থেকে পিছিয়ে পড়া লোকদের সাথে চলতে।এতে নাকি তাদের ধর্ম নষ্ট হয়।কিন্তু ঈশ্বর তো থাকেন কুলি মজুর শ্রমিক শূদ্রদের মাঝে।আর এঁদেরকে ঘৃণা করা ঈশ্বরকে ঘৃণা করার নামন্তর,এঁদের কে দূরে ঠেলে দেয়া মানে ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া। 


আশা করি বর্ণ প্রথার আদি অন্ত আপনাদের কাছে পরিষ্কার করতে পেরেছি। বর্তমান সমাজ পুনঃনির্মাণে এ প্রথার উপযোগিতা নাই।সমাজে যেহেতু শিক্ষা ও পেশা সবার জন্য উন্মুক্ত তাই এ প্রথা আজ অপপ্রথায় পরিণত হয়েছে।বরং সমাজে বর্ণ ভেদের কারনে বিভাজন দৃশ্যমান, অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দারিয়েছে।এ কারনে চূড়ান্ত রুপে এ প্রথাকে বরজন করাই মঙ্গলজনক। আর বর্ণভেদকে মনে আশ্রয় দেবার অর্থ হল পবিত্র ধর্মের বানীকে অস্বীকার করে অধর্মের পথে পা বাড়ান।এ জন্য আসুন শুধু কথায় নয় হৃদয় হতে বর্ণভেদের কালিমা ধুয়ে ফেলি সম্পূর্ণরূপে- চিরতরে।


মূর্তিপুজা কি এবং কেন




অনেকেই সনাতন ধর্মের মূর্তি পূজা নিয়ে প্রশ্ন করেন।এ প্রশ্ন যে শুধু অন্য ধর্মের লোকেরা করেন তাই নয় বরং অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও করেন। আজ তাই আপনাদের মূর্তি পূজা কি এবং কেন করা হয় তা সনাতন দর্শনের আলোকে তুলে ধরব।
মূর্তি পূজার স্বরূপ জানতে হলে প্রথমে আমাদেরকে জানতে হবে  ঈশ্বর ও দেবতা বলতে সনাতন দর্শনে কি বলা হয়েছে।

ঈশ্বর ও দেবতাঃ
প্রথমেই বলে রাখা দরকার সনাতন দর্শনে বহু ঈশ্বরবাদের স্থান নাই বরং আমরা একেশ্বরবাদে বিশ্বাসীহিন্দু শাস্ত্র মতে , ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়।সনাতন দর্শন বলে, ঈশ্বর স্বয়ম্ভূ অর্থাৎ ঈশ্বর নিজে থেকে উৎপন্ন, তার কোন স্রষ্টা নাই, তিনি নিজেই নিজের স্রষ্টা।আমাদের প্রাচীন ঋষিগন বলে গিয়েছেন, ঈশ্বরের কোন নির্দিষ্ট রূপ নেই(নিরাকার ব্রহ্ম)  তাই তিনি অরূপ, তবে তিনি যে কোন রূপ ধারন করতে পারেন কারণ তিনিই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।ঋকবেদে বলা আছে, ঈশ্বর ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’- ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়।ঈশ্বর বা ব্রহ্ম (ব্রহ্মা নন) সম্পর্কে আরও বলা হয়, ‘অবাংমনসগোচরম’ অর্থাৎ ঈশ্বরকে কথা(বাক), মন বা চোখ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, তিনি বাহ্য জগতের অতীতঈশ্বর সম্পর্কে ঋকবেদে বলা আছে-
‘একং সদ বিপ্রা বহুধা বদন্তি (ঋক-১/৬৪/৪৬) অর্থাৎ সেই এক ঈশ্বরকে পণ্ডিতগণ বহু নামে  বলে থাকেন।
‘একং সন্তং বহুধন কল্পায়ন্তি’ (ঋক-১/১১৪/৫) অর্থাৎ সেই এক ঈশ্বরকে বহুরূপে কল্পনা করা হয়েছে।
‘দেবানাং পূর্বে যুগে হসতঃ সদাজায়ত’ (ঋক-১০/৭২/৭) অর্থাৎ দেবতারও পূর্বে সেই অব্যাক্ত(ঈশ্বর) হতে ব্যক্ত জগত উৎপন্ন হয়েছে।  
ঈশ্বর এক কিন্তু দেবদেবী অনেক। তাহলে দেব দেবী কারা? মনে রাখতে হবে দেব দেবীগণ ঈশ্বর নন। ঈশ্বরকে বলা হয়  নির্গুণ অর্থাৎ জগতের সব গুনের(quality) আধার তিনি। আবার ঈশ্বর সগুনও কারণ সর্ব শক্তিমান ঈশ্বর চাইলেই যে কোন গুনের অধিকারী হতে পারেন এবং সেই গুনের প্রকাশ তিনি ঘটাতে পারেনদেব দেবীগন ঈশ্বরের এই সগুনের প্রকাশ।অর্থাৎ ঈশ্বরের এক একটি গুনের সাকার প্রকাশই দেবতা। ঈশ্বর নিরাকার কিন্তু তিনি যে কোন রূপে সাকার হতে পারেন আমাদের সামনে   কারণ তিনি সর্ব ক্ষমতার অধিকারী। যদি আমরা বিশ্বাস করি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান তাহলে নিরাকার ঈশ্বরের সাকার গুনের প্রকাশ খুবই স্বাভাবিক।তাই ঈশ্বরের শক্তির সগুন রূপ দুর্গা, কালী, পার্বতী;বিদ্যার সগুন রূপ সরস্বতী; ঐশ্বর্যের সগুন রূপ লক্ষ্মী, মৃত্যুর রূপ যম। তেমনি ঈশ্বর যখন সৃষ্টি করেন তখন ব্রহ্মা ( ব্রহ্ম নয়), যখন পালন করেন তখন বিষ্ণু আর প্রলয়রূপে শিব।এজন্য বলা হয়ে থাকে ঈশ্বরই ব্রহ্মা,তিনিই বিষ্ণু, তিনিই শিব। তাহলে আমারা এখন বুঝতে পারছি দেব দেবী অনেক হতে পারে কিন্তু ঈশ্বর এক এবং দেবতাগণ এই পরম ব্রহ্মেরই বিভিন্ন রূপতাই হিন্দুরা বহু দেবোপাসক(বস্তুত দেবোপাসনা ঈশ্বর উপাসনাই) হতে পারে তবে বহু ঈশ্বরবাদী নন।

এতক্ষন আপনাদেরকে বললাম ঈশ্বর আর দেবতার পার্থক্য। এখন বলব তাহলে আমরা কেন এ সকল দেব দেবীগণের মূর্তি পূজা করি।

মূর্তি পূজার রহস্যঃ 
মানুষের মন স্বভাবতই চঞ্চল।পার্থিব জগতে আমাদের চঞ্চল মন নানা কামনা বাসনা দিয়ে আবদ্ধ। আমরা চাইলেই এই কামনা বাসনা বা কোন কিছু পাবার আকাংক্ষা থেকে মুক্ত হতে পারি না।(ধরুন একজন শিক্ষার্থী তাঁর শিক্ষা জীবনের বাসনা থাকে পরীক্ষায় প্রথম হউয়া।এ জন্য সে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা করে।) তীব্র গতির এই মনকে সংযত করা, স্থির করার ব্যবস্থা করা হয় এই সগুন ঈশ্বরের বিভিন্ন রুপের মাধ্যমে।মনে রাখতে হবে আমরা কখনই ঈশ্বরের বিশালতা বা অসীমতা কে আমদের সসীম চিন্তা দিয়ে বুঝতে পারব না। বরং সর্বগুণময় ঈশ্বরের কয়েকটি বিশেষ গুনকেই বুঝতে পারব।আর এ রকম এক একটি গুনকে বুঝতে বুঝতে হয়ত কোন দিন সেই সর্ব গুণময়কে বুঝতে পারব।আর মূর্তি বা প্রতিমা হল এসকল গুনের রূপকল্প বা প্রতীক। এটা অনেকটা গনিতের সমস্যা সমাধানের জন্য ‘x’ ধরা। আদতে x কিছুই নয় কিন্তু এক্স ধরেই হয়ত আমরা গনিতের সমস্যার উত্তর পেয়ে যাই। অথবা ধরুন জ্যামিতির ক্ষেত্রে আমরা কোন কিছু বিন্দু দিয়ে শুরু করি। কিন্তু বিন্দুর সংজ্ঞা হল যার দৈর্ঘ, প্রস্থ ও বেধ নাই কিন্তু অবস্থিতি আছে – যা আসলে কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়।অথচ এই বিন্দুকে আশ্রয় করেই আমরা প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতা থেকে হিমালয়ের উচ্চতা সব মাপতে পারি। আবার ধরুন ভূগোল পড়ার সময় একটি গ্লোব রেখে কল্পনা করি এটা পৃথিবী আবার দেয়ালের ম্যাপ টানিয়ে বলি এটা লন্ডন, এটা ঢাকা এটা জাপান। কিন্তু ঐ গ্লোব বা ম্যাপ কি আসলে পৃথিবী? অথচ ওগুলো দেখেই আমরা পৃথিবী চিনছি।
তেমনি মূর্তির রূপ কল্পনা বা প্রতিমা স্বয়ং ঐসকল দেবতা নন তাঁদের প্রতীক, চিহ্ন বা রূপকল্প।এগুলো রূপকল্প হতে পারে কিন্তু তা মনকে স্থির করতে সাহায্য করে এবং ঈশ্বরের বিভিন্ন গুন সম্পর্কে ধারনা দেয়, শেখায় ঈশ্বর সত্য সব শেষে পরম ব্রহ্মের কাছে পৌছাতে সাহায্য করে। হিন্দু ধর্মে পূজা একটি বৈশিষ্ট্য। কল্পনায় দাড়িয়ে সত্য উত্তরণই পূজার সার্থকতা। আমাদের ধর্মে ঈশ্বরের নিরাকার ও সাকার উভয় রূপের উপাসনার বিধান আছে।নিরাকার ঈশ্বরের কোন প্রতিমা নাই, থাকা সম্ভবও না। যারা ঈশ্বরের অব্যক্ত বা নিরাকার উপাসনা করেন তাঁদের বলে নিরাকারবাদি। আর যারা ঈশ্বরের সাকার রূপের উপাসনা করেন তাঁরা সাকারবাদি। এজন্য গীতায় বলা আছে, যারা নিরাকার, নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনা করেন তারাও ঈশ্বর প্রাপ্ত হন।তবে নির্গুণ উপাসকদের কষ্ট বেশি। কারণ নিরাকার ব্রহ্মে মনস্থির করা মানুষের পক্ষে খুবই ক্লেশকর।

তবে কি হিন্দুরা পৌত্তলিকঃ
অন্য ধর্মের লোকেরা সনাতন দর্শন সম্পর্কে না জেনেই মূর্তি পূজা দেখে মন্তব্য করে বসেন হিন্দুরা পৌত্তলিক। কিন্তু সঠিক দর্শন জানলে তাঁদের এ ভুল ধারনা ভাংবে।আগেই বলেছি আমাদের দেবতা অনেক কিন্তু ঈশ্বর এক।ঈশ্বরের কোন প্রতিমা নেই। দেবতারা হলেন ঈশ্বরের এক একটি রূপের বা গুনের প্রকাশ।মূর্তি বা প্রতিমা হল সে সকল গুনের প্রতীক, চিহ্ন বা রূপকল্প। সব ধর্মেই এমন রূপকল্প, চিহ্ন বা প্রতীক আছে যা তাঁদের কাছে পবিত্র। যেমন ধরুন খৃস্টানদের গির্জায় মাতা মেরী বা ক্রুশবিদ্ধ যীশুর প্রতিমা থাকে যার সামনে তাঁরা নতজানু হয়ে প্রার্থনা করে।আবার ধরুন মুসলিমরা কাবাশরীফকে পবিত্র মনে করে চম্বন করে কিংবা কোন কাগজে আরবিতে আল্লাহ লেখা থাকলে তাকে সম্মান দেয়, তাকে যেখানে সেখানে ফেলে দেয় না। তাহলে ঐ কাগজখানা কি আল্লাহ নিজে? না । কিন্তু তারপরও তাকে সম্মান করে কারণ তা আল্লাহর নাম ওটা দেখে আল্লাহর কথা মনে আসে, তার প্রতি ভালবাসা প্রকাশ পায়। কেউ কেউ শুন্যপানে চেয়ে প্রার্থনা করেন।তাহলে কি ঐ শুন্যপানে ঈশ্বরের বসতি।আসলে তা নয়।কিন্তু আমারা তো এভাবে প্রার্থনা করি।এভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় জগতের সবাই পৌত্তলিক।
  
এ প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের একটি ঘটনার কথা বললে আপনারা বুঝতে পারবেন। পরিব্রাজক স্বামী বিবেকানন্দ তখন আলোয়ারের মহারাজের অতিথি । আলোয়ার রাজ কথাপ্রসঙ্গে স্বামীজিকে জানালেন যে মূর্তি পূজায় তিনি বিশ্বাস করেননা । স্বামীজি একথা শুনে মহারাজার একটি চিত্র আনতে বললেন এবং রাজার দেওয়ানকে বললেন ওই ছবির উপর থুথু ফেলতে ।

সমস্ত রাজসভা নিঃশব্দে এই দৃশ্য দেখতে লাগল । দেওয়ান স্বামিজির নির্দেশ পালনে অসমর্থ হলেন , তখন স্বামীজি বললেন , ' এই ছবি তো একটি রং করা কাগজ মাত্র , এই ছবি তো আর রাজা নয় , তাহলে এর উপর থুথু ফেলতে অসুবিধা কোথায় ? ' স্বামীজির বারংবার নির্দেশ সত্ত্বেও দেওয়ান যখন রাজার ছবিতে থুথু ফেলতে পারলেননা তখন স্বামীজি রাজাকে বুঝিয়ে বললেন , '' ফটোগ্রাফ তো একটি জড়বস্তু , একখণ্ড রং করা কাগজ মাত্র । তবু ওই ছবিটি আসল মানুষটিকে মনে করিয়ে দেয় । ছবিটির দিকে দেখলে আমরা ভাবিনা যে নিছক কোনও রং করা কাগজ দেখছি । ঠিক তেমনই আমরা যখন মাটির মূর্তি পূজা করি আমরা মনে করি স্বয়ং ভগবানকেই পূজা করছি । আমরা সে সময় কখনও মনে করিনা আমরা কোনও জড় মূর্তি বা খড় বা মাটির উপাসনা করছি ।

আমরা দেবতার মূর্তিকে শুধুমাত্র প্রতীক মনে করি এর বেশি কিছু নয়এজন্য পূজার সময় পূজারী ব্রাহ্মণগন মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে প্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন অর্থাৎ ধরে নেয়া হয় দেবতাগন ঐ প্রতিমায় ভাস্বর হয়ে উঠবেন।আবার কাঠমাটির প্রতিমা যে ঐ সকল দেবতা নয় তার প্রমান মেলে পূজার পর প্রতিমা গুলোকে জলে বিসর্জন দিয়ে, যদি প্রতিমাকেই ঐ সকল দেবতা মনে করা হত তাহলে নিশ্চয় কেউ তা জলে বিসর্জন দিত না।   

তাই হিন্দুর দেবমূর্তি পুতুল নয়।তা চিন্ময় ভগবানেরই প্রতীক। সনাতন ধর্মে ঈশ্বরের নিরাকার ও সাকার উভয় রূপের উপাসনার বিধান আছে। যারা ঈশ্বরের অব্যক্ত বা নিরাকার উপাসনা করেন তাঁদের বলে নিরাকারবাদি। আর যারা ঈশ্বরের সাকার রূপের উপাসনা করেন তাঁরা সাকারবাদি। এজন্য স্বামী বিবেকানন্দের বলেছেন, ‘পুতুল পূজা করে না হিন্দু/ কাঠ মাটি দিয়ে গড়া। মৃন্ময়ী মাঝে চিন্ময়ী হেরে, হয়ে যাই আত্মহারা।‘


এখন প্রশ্ন আসতে পারে আমরা কেন তাহলে নিরাকার ঈশ্বরের পূজা না করে সাকার ঈশ্বরের পূজা করি?
জাগতিক মোহ থেকে সাকার পূজা করা হয়ে থাকে। আগেই বলেছি যে বিদ্যা চায় সে সরস্বতী দেবীর প্রার্থনা করে, যে অর্থ চায় সে লক্ষ্মী দেবীর প্রার্থনা করে তেমনি যে বিভিন্ন বাধা বিপত্তি থেকে উদ্ধার চায় সে দুর্গা পূজা করে।এজন্য গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেন,“জড় বাসনার দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে তাঁরাই অন্য দেবদেবীর পূজা করেন এবং স্বীয় স্বভাব অনুসারে নিয়ম পালন করে দেবতাদের উপাসনা করেন”দেবতার রূপ ও গুন মানুষের বিচিত্র রুচিকে তৃপ্ত করে ও চঞ্চল মনকে অচঞ্চল করতে সহায়তা করে।আমাদের মন যে চঞ্চল তার উদাহরণ মন্দির বা উপাসনালয়ে গেলে মনে পবিত্রতা আসে, মন প্রাশান্ত হয়,মনে ভক্তি জেগে ওঠে।অথচ ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান।তাহলে কেন শুধুমাত্র মন্দিরে গেলেই মনে বেশি ভক্তিভাব আসে।আসলে জাগতিক মোহে আবদ্ধ হয়ে আমরা ঈশ্বরের এই সর্ববিরাজমানতা ভুলে যাই।আর যারা সবখানে ঈশ্বরের এই অস্তিত্ব অনুভব করতে পারেন তারাই নিরাকার উপাসনার যোগ্য।তেমনি একটি ছোট বাচ্চাকে কিংবা কোন অজ্ঞ ব্যক্তিকে নিরাকার ঈশ্বর সম্পর্কে ধারনা দিবেন সে বুঝবে না বরং সে সহজে বুঝবে সাকার দেবতারূপ ঈশ্বরকে।এই সাকার রূপের প্রতিমা দেখে সহজেই বুঝতে শিখবে ঈশ্বরের গুনের কথা,শক্তির স্বরূপ সম্পর্কে ।এভাবে শুরুতে সাকার উপাসনার মধ্য দিয়েই নিরাকার উপাসনার যোগ্যতা অর্জন হয় আমাদের।
তবে সব কিছুই যেহেতু সেই অসীমেরই অংশ তাই শ্রদ্ধা সহকারে দেবতার পুজাও পরোক্ষভাবে ঈশ্বরের উপাসনা।এজন্য সনাতন সংস্কৃতিতে দেখা যায় শুধু মাত্র দেবতা নয় উদ্ভিদ,উপকারী প্রানি এমনকি মনুষ্য পুজাও করে থাকেন অনেকে। তবে দেবোপাসনায় কাম্য বস্তু লাভ হলেও ঈশ্বর লাভ হয় না।শুধুমাত্র পরম ঈশ্বরের উপাসনাতেই ঈশ্বর লাভ হয়।এজন্য গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেন, ‘যন্তি মদযাজীনহপি মাম ’ (গীতা-৯/২৫) অর্থাৎ একমাত্র আমার ভক্তগণই আমাকে প্রাপ্ত হন।

মূর্তি বা ভগবত বিগ্রহ প্রতীক বটে তবে মূর্তি পূজা সম্পর্কে এটাই শেষ কথা নয়।সাধনা যাত্রার প্রারম্ভে শ্রীমূর্তি হতে পারে কিন্তু সাধনার পরিনতিতে উহা চিন্ময় সত্তা। প্রতীক রুপটি চিন্ময় রুপে পরিনতি হলেই পূজা সার্থক হয়।যিনি একদিন ছিলেন অপরিচিত লোক – তারই সঙ্গে বহু মেলামেশার পর যেমন তিনি হয়ে ওঠেন পরম বন্ধু – সেইরুপ প্রতীক রূপে যে মূর্তির হয় প্রতিষ্ঠা, ভক্তের অর্চনার ফলে তিনিই হয়ে ওঠেন সাক্ষাৎ ভগবান, আচার্য রামানুজের কথায় ‘ অরচ্চাবতার’।

আচার্য রামানুজের কাছে একদিন এক মূর্তি পুজায় আস্থাহীন ব্যক্তি এসে উপস্থিত হন।তিনি আচার্যকে জিজ্ঞেস করেন, ব্রহ্ম বিশ্ব ব্যাপী, তাকে পূজা করার জন্য আপনি ছোট ছোট কতগুলি পিতলের মূর্তি রেখেছেন কেন? আচার্য বললেন, আমার ধুনি জ্বালাবার জন্য আগুনের দরকার, আপনি গ্রাম হতে আমাকে আগুন এনে দিন , তারপর আপনার প্রশ্নের জবাব দিব।
ঐ লোকটি একখানা কাঠে আগুণ নিয়ে উপস্থিত হলেন। আচার্য তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এক খণ্ড দগ্ধ কাঠ এনেছেন কেন? যা বলেছি তাই আনুন। আগুন বলেছি আগুন আনুন। আগুন সকল বস্তুর মধ্যেই আছে। আপনার হাত ঘষে দেখুন, হাতের মধ্যেও আগুন আছে।আপনি আমার  জন্য একটু খাটি আগুন আনুন। পোড়া কাষ্ঠ চাই না
আচার্যের কথা শুনে লোকটি বললেন, অগ্নি সব বস্তুর মধ্যেই আছে কিন্তু আপনার নিকট আনতে হলে কাষ্ঠ ছাড়া উপায় দেখি না।
তখন আচার্য বললেন, সকল বস্তুর মধ্যে নিহিত অগ্নিকে আমার নিকট আনতে হলে কাষ্ঠ ছাড়া উপায় দেখেন না- আমিও সেই রূপ সর্বভুতস্থ সর্বব্যাপী পরম ব্রহ্মকে আমার নিকটতম আনতে চাইলে মূর্তিকে আরোপ ছাড়া উপায় দেখি নাআপনার হাতের কাষ্ঠ খান আগে ছিল কাষ্ঠ কিন্তু তাতে অগ্নি ধরাবার পর তা হয়ে উঠেছে অগ্নি, তেমনি আমার নিকটস্থ এই ঠাকুরটি এক সময় ছিলেন পিতল নির্মিত মূর্তি এখন সেটি চিন্ময় ব্রহ্ম। ইহা সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ।নারায়ণ যেমন অযোধ্যায় এসেছিলেন রাম রূপে, তিনি আজ আমার দুয়ারে এসেছেন অর্চচাবতার রূপে। আচার্যের উক্তিটি জিজ্ঞাসু ব্যক্তিটির সকল সংশয় দূর করে দিল। 
      
আশা করি সকলে মূর্তি পূজা কি এবং কেন করা হয় তা বুঝতে পেরেছেন।যারা সনাতনিদের প্রতিমা পূজা কে পৌত্তলিক বলে তাঁদের দার্শনিক দারিদ্রতাই প্রবলভাবে ফুটে ওঠে।হিন্দুরা কখনোই প্রতিমাকেই ঈশ্বর মনে করে না। হাস্যকর হলেও সত্যযারা প্রতিমা ভাংচুর করে তারা প্রতিমাকেই হিন্দুদের ভগবান মনে করে ভাংচুর চালায়। হিন্দুরা মূর্তিকে ঈশ্বরের প্রতীক হিসেবে উপাসনা করে এবং পূজা শেষে জলে প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়,কারণ হিন্দুরা জানে প্রতিমা কাঠ-খড়-মাটি ছাড়া কিছু নয়। মূর্তির জীবন আছে -এরকম কখনোই ভাবে নাভাবে তারাইযারা মূর্তি ভাংচুর করে। ব্যাপারটা বেশ হাস্যকর আর দুঃখজনকও বটে। (চুপি চুপি বলে রাখিকোন কোন ধর্মের শাস্ত্রে বলা হয়েছেমূর্তিপূজকদের আর তাদের মূর্তিগুলোকেও নরকের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। মূর্তিগুলোও নাকি যন্ত্রণায় চিত্কার করবে মূর্তিপূজকদের সাথে!!! হিঃ হিঃ হিঃ খিক্ খিক্।) সনাতন দর্শনেই সাকার ও নিরাকার উভয় ধরনের উপাসনার মাধ্যমে ঈশ্বর পূজিত হন আর এভাবে জগতের সকল মত আর পথকে সনাতন দর্শন তার অংশ করে নিয়েছে; বলেছে সব পথেরই শেষ এক ঠিকানায়

শিব লিঙ্গ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণার অবসান হোক




অনেকেই পেজে প্রশ্ন করে শিব লিঙ্গের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন।অনেকে আমাদের কে লিখেছেন যে, তাদের লজ্জা লাগে শিব লিঙ্গ দেখে কারন তাদের অহিন্দু বন্ধুরা এটা নিয়ে উপহাস করে এবং শিব লিঙ্গকে পুরুষাঙ্গের অনুকল্প বলে মনে করে, জাগতিক ভোগ ও বাসনার সাথে মিশিয়ে ফেলে।আবার অনেকে শিব লিঙ্গকে বলতে চান, লিঙ্গ ও যোনির সম্মিলিত রূপটি "নারী ও পুরুষের অবিভাজ্য ও অদ্বৈত সত্ত্বা, পরোক্ষ স্থান ও প্রত্যক্ষ সময়, যা থেকে সকল জীবনের উৎপত্তি", তার প্রতীক। 


আসলে হাজার বছরের বিদেশি শাসনে পরাধীন থাকায় বিদেশী শাসকগন সনাতন ধর্মকে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করেছে। শুধু উপাসনালয় ভেঙ্গেই ক্ষান্ত থাকেনি, নানা কুৎসা রটাতেও পিছপা হয়নি। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় মুসলিম শাসকরা মন্দির ধ্বংসে মনযোগী ছিল আর ইংরেজরা মন্দির ভাঙ্গেনি ঠিক তবে বুদ্ধিমান পাদ্রীরা আমাদের ধর্মকে আঘাত করেছে অন্যভাবে। ১৮১৫ সালে আ ভিউ অফ দ্য হিস্ট্রি, লিটারেচার, অ্যান্ড মিথোলজি অফ দ্য হিন্দুজ গ্রন্থে লেখক ব্রিটিশ মিশনারি উইলিয়াম ওয়ার্ড হিন্দুদের অন্যান্য ধর্মীয় প্রথার সঙ্গে লিঙ্গপূজারও নিন্দা করেছিলেন। তাঁর মতে লিঙ্গপূজা ছিল, "মানুষের চারিত্রিক অবনতির সর্বনিম্ন পর্যায়"শিবলিঙ্গের প্রতীকবাদটি তাঁর কাছে ছিল "অত্যন্ত অশালীন; সে সাধারণের রুচির সঙ্গে মেলানোর জন্য এর যতই পরিমার্জনা করা হোক না কেন"ব্রায়ান পেনিংটনের মতে, ওয়ার্ডের বইখানা "ব্রিটিশদের হিন্দুধর্ম সম্পর্কে ধারণা ও উপমহাদেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়েছিল" ব্রিটিশরা মনে করত, শিবলিঙ্গ পুরুষ যৌনাঙ্গে আদলে নির্মিত এবং শিবলিঙ্গের পূজা ভক্তদের মধ্যে কামুকতা বৃদ্ধি করে।প্রতীক।"ডেভিড জেমস স্মিথ প্রমুখ গবেষকেরা মনে করেন, শিবলিঙ্গ চিরকালই পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গটি বহন করছে।জেনেন ফলারের মতে, লিঙ্গ "পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গে নির্মিত এবং এটি মহাবিশ্ব-রূপী এক প্রবল শক্তির।

আবার ইউরোপের সব বুদ্ধিজীবী হিন্দু বিদ্বেষী ছিল এটা বলা অন্যায় হবে।কারন অনেকেই শিব লিঙ্গ সম্পর্কে উপরোক্ত মতবাদকে গ্রহণ না করে সত্য অনুসন্ধান করেছেন। যেমন ১৮২৫ সালে হোরাস হেম্যান উইলসন দক্ষিণ ভারতের লিঙ্গায়েত সম্প্রদায় সম্পর্কে একটি বই লিখে এই ধারণা খণ্ডানোর চেষ্টা করেছিলেন।


নৃতাত্ত্বিক ক্রিস্টোফার জন ফুলারের মতে, হিন্দু দেবতাদের মূর্তি সাধারণত মানুষ বা পশুর অনুষঙ্গে নির্মিত হয়। সেক্ষেত্রে প্রতীকরূপী শিবলিঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম।কেউ কেউ মনে করেন, লিঙ্গপূজা ভারতীয় আদিবাসী ধর্মগুলি থেকে হিন্দুধর্মে গৃহীত হয়েছে।


এবার আমরা জানব শিবলিঙ্গ আসলে কিঃ
_______________________________________________ 

শিবলিঙ্গ বা লিঙ্গম্‌ দেবতা শিবের একটি প্রতীক।আমি যদি এক কথায় বলি তাহলে,শিব শব্দের শাব্দিক অর্থ মঙ্গল; আর লিঙ্গ মানে চিহ্ন।অর্থাৎ শিবলিঙ্গ মানে মঙ্গলময় চিহ্ন। হিন্দু মন্দিরগুলিতে সাধারণত শিবলিঙ্গে শিবপূজা করা হয়ে থাকে।একটি সাধারণ তত্ত্ব অনুযায়ী, শিবলিঙ্গ শিবের আদি-অন্তহীন সত্ত্বার প্রতীক এক আদি ও অন্তহীন স্তম্ভের রূপবিশেষ।


শিব এক অনাদি অনন্ত লিঙ্গস্তম্ভের রূপে আবির্ভূত, বিষ্ণু বরাহ বেশে স্তম্ভের নিম্নতল ও ব্রহ্মা ঊর্ধ্বতল সন্ধানে রত। এই অনাদি অনন্ত স্তম্ভটি শিবের অনাদি অনন্ত সত্ত্বার প্রতীক মনে করা হয়।



শিবলিঙ্গ একটি গোল কিম্বা উপবৃত্তাকার যা কোন বৃত্তাকার ভূমি (base ) কে কেন্দ্র করে স্থাপিত । এই গোল ভূমি কে আদি পরশক্তি বা চূড়ান্ত শক্তি ।আর সেই গোল কিম্বা বৃত্তাকার অংশ দ্বারা অসীম কে বোঝান হয় যার কোন আদি অন্ত নেই অর্থাৎ যা সর্ববিরাজমান । সর্ববিরাজমান অর্থ হল যা সব জায়গায় অবস্থিত ।
শিবলিঙ্গ ধরনাটি সাধারণত infinity বোঝাতে কিম্বা জীবনের continuation বোঝাতে অবতারণা করা হয়।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় অথর্ববেদে একটি স্তম্ভের স্তব করা হয়েছে। এটিই সম্ভবত শিব লিঙ্গ পূজার উৎস। কারোর কারোর মতে যূপস্তম্ভ বা হাঁড়িকাঠের সঙ্গে শিবলিঙ্গের যোগ রয়েছে। উক্ত স্তবটিকে আদি-অন্তহীন এক স্তম্ভ বা স্কম্ভ-এর কথা বলা হয়েছে; এই স্কম্ভ চিরন্তন ব্রহ্মের স্থলে স্থাপিত। যজ্ঞের আগুন, ধোঁয়া, ছাই, সোমরস ও যজ্ঞের কাঠ বহন করার ষাঁড় ইত্যাদির সঙ্গে শিবের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির যোগ লক্ষিত হয়। মনে করা হয়, কালক্রমে যূপস্তম্ভ শিবলিঙ্গের রূপ নিয়েছিল। লিঙ্গপুরাণে এই স্তোত্রটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি কাহিনির অবতারণা করা হয়। এই কাহিনিতে উক্ত স্তম্ভটিকে শুধু মহানই বলা হয়নি বরং মহাদেব শিবের সর্বোচ্চ সত্ত্বা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত ও কম্বোডিয়ায় প্রচলিত প্রধান শৈব সম্প্রদায় ও অনুশাসন গ্রন্থ শৈবসিদ্ধান্ত মতে, উক্ত শৈব সম্প্রদায়ের প্রধান উপাস্য দেবতা পঞ্চানন (পাঁচ মাথা-বিশিষ্ট) ও দশভূজ (দশ হাত-বিশিষ্ট) সদাশিব প্রতিষ্ঠা ও পূজার আদর্শ উপাদান হল শিবলিঙ্গ।


মনিয়ার উইলিয়ামস তাঁর ব্রাহ্মণইজম্‌ অ্যান্ড হিন্দুইজম্‌ বইয়ে লিখেছেন, "লিঙ্গ" প্রতীকটি "শৈবদের মনে কোনো অশালীন ধারণা বা যৌন প্রণয়াকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয় না। অন্যদিকে এন. রামচন্দ্র ভট্ট প্রমুখ গবেষকেরা মনে করেন, পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গটি অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের রচনা।এম. কে. ভি. নারায়ণ শিবলিঙ্গকে শিবের মানবসদৃশ মূর্তিগুলি থেকে পৃথক করেছেন। তিনি বৈদিক সাহিত্যে লিঙ্গপূজার অনুপস্থিতির কথা বলেছেন এবং এর যৌনাঙ্গের অনুষঙ্গটিকে তান্ত্রিকসূত্র থেকে আগত বলে মত প্রকাশ করেছেন।

১৯০০ সালে প্যারিস ধর্মীয় ইতিহাস কংগ্রেসে  ভারত সন্ন্যাসী  স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, শিবলিঙ্গ ধারণাটি এসেছে বৈদিক যূপস্তম্ভ বা স্কম্ভ ধারণা থেকে।  ১৯০০ সালে প্যরিসে হয়ে যাওয়া ধর্মসমূহের ঐতিহাসিক মূল শীর্ষক সম্মেলনে বিশ্ববাসীর সামনে অথর্ববেদের স্কম্ভসুক্তের সাহায্যে তুলে ধরেন যে শিবলিঙ্গ মূলত বিশ্বব্রহ্মান্ডের ই প্রতীক।যূপস্তম্ভ বা স্কম্ভ হল বলিদানের হাঁড়িকাঠ। এটিকে অনন্ত ব্রহ্মের একটি প্রতীক মনে করা হত।জার্মান প্রাচ্যতত্ত্ববিদ গুস্তাভ ওপার্ট শালগ্রাম শিলা ও শিবলিঙ্গের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে তাঁর গবেষণাপত্রে এগুলিকে পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গে সৃষ্ট প্রতীক বলে উল্লেখ করে তা পাঠ করলে, তারই প্রতিক্রিয়ায় বিবেকানন্দ এই কথা বলেছিলেন।বিবেকানন্দ বলেছিলেন, শালগ্রাম শিলাকে পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গ বলাটা এক কাল্পনিক আবিষ্কার মাত্র। তিনি আরও বলেছিলেন, শিবলিঙ্গর সঙ্গে পুরুষাঙ্গের যোগ বৌদ্ধধর্মের পতনের পর আগত ভারতের অন্ধকার যুগে কিছু অশাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তির মস্তিস্কপ্রসূত গল্প।

স্বামী শিবানন্দও শিবলিঙ্গকে যৌনাঙ্গের প্রতীক বলে স্বীকার করেননি।স্বামী শিবানন্দ বলেন,"এটি শুধু ভূল ই নয় বরং অন্ধ অভিযোগ ও বটে যে শিবলিঙ্গ পুরুষলিঙ্গের প্রতিনিধিত্বকারী।"তিনি লিঙ্গপুরানের নিম্নলিখিত শ্লোকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন-
"
প্রধানাম প্রকৃতির যদাধুর লিঙ্গমুত্তমম গান্ধবর্নরসাহৃনম শব্দ স্পর্শাদি বর্জিতম"
অর্থাত্‍ লিঙ্গ হল প্রকৃতির সর্বোচ্চ প্রকাশক যা স্পর্শ, বর্ন,গন্ধহীন।

১৮৪০ সালে এইচ. এইচ. উইলসন একই কথা বলেছিলেন।ঔপন্যাসিক ক্রিস্টোফার ইসারউড লিঙ্গকে যৌন প্রতীক মানতে চাননি।ব্রিটানিকা এনসাইক্লোপিডিয়ায় "Lingam" ভুক্তিতেও শিবলিঙ্গকে যৌন প্রতীক বলা হয়নি।

মার্কিন ধর্মীয় ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ওয়েনডি ডনিগার
তাঁর দ্য হিন্দুজ: অ্যান অল্টারনেটিভ হিস্ট্রি বইতে লিখেছেন, কোনো কোনো ধর্মশাস্ত্রে শিবলিঙ্গকে ঈশ্বরের বিমূর্ত প্রতীক বা দিব্য আলোকস্তম্ভ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সব বইতে লিঙ্গের কোনো যৌন অনুষঙ্গ নেই।

হেলেন ব্রুনারের মতে, লিঙ্গের সামনে যে রেখাটি আঁকা হয়, তা পুরুষাঙ্গের গ্ল্যান্স অংশের একটি শৈল্পিক অনুকল্প। এই রেখাটি আঁকার পদ্ধতি মধ্যযুগে লেখা মন্দির প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত অনুশাসন এবং আধুনিক ধর্মগ্রন্থেও পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠাপদ্ধতির কিছু কিছু প্রথার সঙ্গে যৌন মিলনের অনুষঙ্গ লক্ষ্য করা যায়। যদিও গবেষক এস. এন. বালগঙ্গাধর লিঙ্গের যৌন অর্থটি সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। 

এ লেখাটা লিখেছি সনাতনীদের জন্য। যারা শিব লিঙ্গ কি তা জানেন না অথবা ভুল জেনে লজ্জিত হন।যারা সর্বদা হিন্দু ধর্মের ছিদ্রান্বেষী তাদের জন্য না কারন ওরা জেগে জেগে ঘুমাতে পছন্দ করে। তবে যারা উদ্দেশ্য মুলক ভাবে শিব লিঙ্গকে অশালীন বলতে চায় তাদের জন্য বলতে চাই দিবা নিশি যে যা ভাবে সব কিছুর ভিতরে তারই প্রতিরূপ খুজে পাবে; এটাই স্বাভাবিক।

Labels

বাংলা (170) বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন (22) ethnic-cleansing (17) ভারতীয় মুসলিমদের সন্ত্রাস (17) islamic bangladesh (13) ভারতে হিন্দু নির্যাতন (12) : bangladesh (11) হিন্দু নির্যাতন (11) সংখ্যালঘু নির্যাতন (9) সংখ্যালঘু (7) আরব ইসলামিক সাম্রাজ্যবাদ (6) minority (5) নোয়াখালী দাঙ্গা (5) হিন্দু (5) hindu (4) minor (4) নরেন্দ্র মোদী (4) বাংলাদেশ (4) বাংলাদেশী মুসলিম সন্ত্রাস (4) ভুলে যাওয়া ইতিহাস (4) love jihad (3) গুজরাট (3) বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন (3) বিজেপি (3) ভারতে অনুপ্রবেশ (3) মুসলিম বর্বরতা (3) হিন্দু নিধন (3) George Harrison (2) Julia Roberts (2) List of converts to Hinduism (2) bangladesh (2) কলকাতা (2) গুজরাট দাঙ্গা (2) বাবরী মসজিদ (2) মন্দির ধ্বংস (2) মুসলিম ছেলেদের ভালবাসার ফাঁদ (2) লাভ জিহাদ (2) শ্ত্রু সম্পত্তি আইন (2) সোমনাথ মন্দির (2) হিন্দু এক হও (2) হিন্দু মন্দির ধ্বংস (2) হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা (2) Bhola Massacre (1) English (1) april fool. মুসলিম মিথ্যাচার (1) converted hindu celebrity (1) converting into hindu (1) dharma (1) facebook (1) gonesh puja (1) gujrat (1) gujrat riot (1) jammu and kashmir (1) om (1) religion (1) roth yatra (1) salman khan (1) shib linga (1) shib lingam (1) swami vivekanada (1) swamiji (1) অউম (1) অক্ষরধাম মন্দিরে জঙ্গি হামলা ২০০২ (1) অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী (1) অর্পিত সম্পত্তি আইন (1) আওরঙ্গজেব (1) আদি শঙ্কর বা শঙ্করাচার্য (1) আর্য আক্রমণ তত্ত্ব (1) আসাম (1) ইতিহাস (1) ইয়াকুব মেমন (1) উত্তরপ্রদেশ (1) এপ্রিল ফুল (1) ওঁ (1) ওঁ কার (1) ওঁম (1) ওম (1) কবি ও সন্ন্যাসী (1) কাদের মোল্লা (1) কারিনা (1) কালীঘাট মন্দির (1) কাশী বিশ্বনাথ মন্দির (1) কৃষ্ণ জন্মস্থান (1) কেন একজন মুসলিম কোন অমুসলিমের বন্ধু হতে পারে না? (1) কেন মুসলিমরা জঙ্গি হচ্ছে (1) কেশব দেও মন্দির (1) খ্রিস্টান সন্ত্রাসবাদ (1) গনেশ পূজা (1) গুজরাটের জঙ্গি হামলা (1) জাতিগত নির্মূলীকরণ (1) জামাআ’তুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (1) জেএমবি (1) দেশের শত্রু (1) ধর্ম (1) ধর্মযুদ্ধ (1) নবদুর্গা (1) নববর্ষ (1) নালন্দা (1) নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় (1) নোয়াখালি (1) পঞ্চ দেবতার পূজা (1) পহেলা বৈশাখ (1) পহেলা বৈশাখ কি ১৪ এপ্রিল (1) পাকিস্তানী হিন্দু (1) পূজা (1) পূজা ও যজ্ঞ (1) পূজার পদধিত (1) পৌত্তলিকতা (1) ফেসবুক (1) বখতিয়ার খলজি (1) বরিশাল দাঙ্গা (1) বর্ণপ্রথা (1) বর্ণভেদ (1) বলিউড (1) বাঁশখালী (1) বিহার (1) বুদ্ধ কি নতুন ধর্ম প্রচার করেছেন (1) বৈদিক ধরম (1) বৌদ্ধ দর্শন (1) বৌদ্ধ ধর্ম (1) ভারত (1) মথুরা (1) মরিচঝাঁপি (1) মানব ধর্ম (1) মিনি পাকিস্তান (1) মীরাট (1) মুক্তমনা (1) মুক্তিযুদ্ধ (1) মুজাফফরনগর দাঙ্গা (1) মুম্বাই ১৯৯৩ (1) মুলতান সূর্য মন্দির (1) মুলায়ম সিং যাদব (1) মুসলিম তোষণ (1) মুসলিম ধর্ষক (1) মুসলিমদের পুড়ে মারার ভ্রান্ত গল্প (1) মুহাম্মদ বিন কাশিম (1) মূর্তি পুজা (1) যক্ষপ্রশ্ন (1) যাদব দাস (1) রথ যাত্রা (1) রথ যাত্রার ইতিহাস (1) রবি ঠাকুর ও স্বামীজী (1) রবি ঠাকুরের মা (1) রবীন্দ্রনাথ ও স্বামীজী (1) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1) রিলিজিওন (1) রুমি নাথ (1) শক্তিপীঠ (1) শঙ্করাচার্য (1) শিব লিংগ (1) শিব লিঙ্গ (1) শিব লিঙ্গ নিয়ে অপপ্রচার (1) শ্রীকৃষ্ণ (1) সনাতন ধর্ম (1) সনাতনে আগমন (1) সাইফুরস কোচিং (1) সালমান খান (1) সোমনাথ (1) স্বামী বিবেকানন্দ (1) স্বামীজী (1) হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম (1) হিন্দু জঙ্গি (1) হিন্দু ধর্ম (1) হিন্দু ধর্ম গ্রহন (1) হিন্দু বিরোধী মিডিয়া (1) হিন্দু মন্দির (1) হিন্দু শিক্ষার্থীদের মগজ ধোলাই (1) হিন্দুধর্মে পৌত্তলিকতা (1) হিন্দুরা কি পৌত্তলিক? (1) ১লা বৈশাখ (1) ১৯৭১ (1)

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Blogger Tips and TricksLatest Tips And TricksBlogger Tricks

সর্বোচ্চ মন্তব্যকারী